NarayanganjToday

শিরোনাম

চাষাড়ায় মসজিদের কাছেই মদের বার, বাড়ছে ক্ষোভ


চাষাড়ায় মসজিদের কাছেই মদের বার, বাড়ছে ক্ষোভ

সরকারি বিধিতে নিষিদ্ধ থাকলেও শহরের একটি মসজিদের পাশেই গড়ে উঠেছে ‘মদের বার’। নানা আপত্তি বিপত্তি থাকলেও, নারকোটিকসের অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পরই শহরের চাষাড়ায় প্যারাডাইজ ভবনে বারের অনুমোদন পেয়েছে আওয়ামী লীগের এক নেতা। যথা শিগগিরই উদ্বোধন করার প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে বার কর্তৃপক্ষ।

এদিকে এই বার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে নগরের অভিভাবক মহলের মাঝে। ক্ষোভ বইছে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব সংশ্লিষ্টদের মাঝেও। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জের নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে জেলা পুলিশ সুপার বরাবর ইতোপূর্বে বার বন্ধের দাবি জানিয়ে আবেদনপত্রও দেওয়া হয়েছিলো।

এছাড়াও এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিলো। কিন্তু এত কিছুর পরও অদৃশ্য এক শক্তির বলে বার উদ্বোধনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছেন বার মালিক উত্তর মতলবের জহিরাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী মুক্তার।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বুধবার (১৫ জানুয়ারি) বিকেলের দিকে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করতে আসলে ক্লাব সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম বার প্রসঙ্গে তীব্র আপত্তি তুলেন এবং এই বার বন্ধের জন্য জোড় দাবি করেন। অন্যথায় সকল সাংবাদিককে সাথে নিয়ে বার গুঁড়িয়ে দিয়ে আসবেন বলেও পুলিশ সুপারকে জানান তিনি।

মাসুম যুক্তি তুলে ধরে বলেছেন, ছোট্ট একটা শহর নারায়ণগঞ্জ। বিভিন্ন জেলা থেকেই লোকজন এসে থাকছে এখানে। নানা অঘটনও ঘটে এই শহরে। এরমধ্যে এমন একটি বার যদি শহরের উপর চালু হয় তাহলে শহরের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবে। সব থেকে বড় কথা হচ্ছে বারের সামনেই একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ, সাথেই রয়েছে প্রেস ক্লাব। বার চালু হলে মুসল্লিরা যাবে কোথায়, আর আমরা সাংবাদিকেরাইবা যাবো কোথায়? তাই জনস্বার্থে এই বার বন্ধ করতে হবে, এখানে বার চালু করতে দিতে পারি না।

শহরের চাষাড়া ভাষা সৈনিক রোডের প্যারাডাইজ ক্যাসেল নামক ভবনের ৯-১১ নম্বর ফ্লোর নিয়ে তৈরি মদের বার উদ্বোধনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এর কর্তৃপক্ষ। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন থেকে রেস্টুরেন্ট ব্যবসার কথা বলে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এর আড়ালেই বার ব্যবসা চালানোর সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।

এদিকে নগরবাসীর এত বিরোধীতার পরও রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে মদের বার করার হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক আখ্যা দিয়েছেন সচেতন মানুষ। কেননা, ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ধরণ দেয়া থাকে। সেই ধরণের মধ্যে রয়েছে ‘রেস্টুরেন্ট’। তাই প্রশ্ন উঠেছে, রেস্টুরেন্টের আড়ালে মদের বার, কী করে হয়? এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের কী কিছুই করার নেই?

যদিও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএফএম এহতেশামূল হক এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ টুডে’কে বলেন, “ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ধরণ দেওয়া আছে। সে ধরণ অনুযায়ী ব্যবসা বৈধ। এর বাইরে অন্য কোনো ব্যবসা পরিচালনা করলে সেটি অবৈধ। তবে, মদের বার, এটা দেখার জন্য আলাদা ডিপার্টমেন্ট আছে। তারা দেখবে সে বিষয়টি।”

সূত্র জানায়, বার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সুপারিশে, এ লাইসেন্স দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে (সদর) আবেদন করতে হয়। আবেদনে উল্লেখিত এলাকা বা স্থানসহ জনসাধারণের এ নিয়ে কোনো বিরোধীতা, আপত্তি আছে কিনা, এমন জানতে চেয়ে সদর দফতর থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হবে সংশ্লিষ্ট এলাকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কাছে। সেটিকে বলা হয়ে থাকে বিভাগীয় আনাপত্তি পত্র (এনওসি)।

অর্থাৎ, আবেদনে উল্লেখিত স্থানে বার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, এতে সাধারণ মানুষের সমস্যা হবে না, ইত্যাদি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা থেকে ‘এনওসি’ পাওয়ার পর বারের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করবে মাদকদ্রব্য অধিদফতর হেডকোয়ার্টার। এই সুপারিশ পর্যালোচনা করে বার প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স ইস্যু করা হয়ে থাকে।

সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে ‘বিভাগীয় আনাপত্তি (এনওসি)’ পেয়েছে ব্লু পেয়ারের মালিক গাজী মুক্তার। এই অনাপত্তি পত্র পাওয়ার পরই তিনি প্যারাডাইজ ভবনে বার প্রতিষ্ঠার আনুসাঙ্গিক কার্যপ্রণালী শুরু করেন।

তবে, নারায়ণগঞ্জ শহরের মত ছোট্ট একটা শহরে, যেখানে অসংখ্য মানুষের আপত্তি রয়েছে বার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সেখানে নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে কীভাবে এনওসি দেওয়া হলো, এ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

এ ব্যাপারে জানতে নারায়ণগঞ্জ টুডে’র থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিলো নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারি পরিচালক সামসুল আলমের সাথে। তিনি মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে জানান, “এটি (ব্ল পেয়ার) এখনও তো চালু হয়নি। আর এটি একটি রেস্টুরেন্ট। তাছাড়া আমরা কোনো এনওসি দিইনি। এ প্রসঙ্গে হেড কোয়ার্টারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন। এ বিষয়ে কথা বলার আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই।”

অন্যদিকে ব্লু পেয়ার বারের মালিক গাজী মুক্তার দাবি করেছেন, “তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এনওসি পেয়েছেন। সেই এনওসি হেডকোয়ার্টরের পাঠোনোর পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় লাইসেন্স দিয়েছে।”

জানা গেছে, ভাষা সৈনিক রোডের প্যারাডাইজ ভবনের তিনটি ফ্লোর ৪০ লাখ টাকা অ্যাডভান্সে ভাড়া নিয়ে ‘ব্লু পেয়ার’ নামক একটি সুসজ্জিত বারের ডেকোরেশনের কাজ সম্পন্ন করেন এর মালিক গাজী মুক্তার। ঢাকায় তার আরও একটি বার রয়েছে।

সূত্র থেকে আরও জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে দুটি মদের বারের অনুমোদন পান গাজী মুক্তার। যার একটি ঢাকায় চালু করেন এবং অপরটির জন্য নারায়ণগঞ্জ বেছে নিয়েছেন। এখানকার একজন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতার লবিং ধরে প্যারাডাইজ ভবনের তিনটি ফ্লোর ভাড়া নেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে জহিরাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী মুক্তার হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নারায়ণগঞ্জ টুডে’কে জানান, এখানে কোনো অবৈধ কিছু হবে না। বৈধ ভাবেই ব্যবসা করা হবে। সরকারি সকল নিয়ম কানুন মেনেই রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার চালু করতে যাচ্ছি। আমি একজন ব্যবসায়ী। এখানে কোনো আওয়ামী লীগ নেতার সাথে পূর্ব পরিচত নই। কোনো ক্লাবেও যাইনি। এখানকার কোনো সমিতর সাথেও আমার সম্পৃক্ততা নেই।

এদিকে বার এর লাইসেন্স প্রসঙ্গে সরকারি বিধিতে স্পষ্ট করেই লেখা আছে, বার পরিচালনার বিষয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার/পৌর চেয়ারম্যানের অনাপত্তিপত্র (সংসদ কার্যকর না থাকলে), স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনাপত্তিপত্র, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মতামত (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির আশেপাশে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় উপাসনালয় থাকবে না। কিন্তু ব্লু পেয়ার বার এর কাছেই শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদ হিসেবে পরিচিত নূর মসজিদ, প্রেসক্লাব এবং আশপাশে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরপরও কীভাবে এই বার চালুর জন্য জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আনাপত্তিপত্র দিলেন?

১৫ জানুয়ারি, ২০২০/এসপি/এনটি

উপরে