NarayanganjToday

শিরোনাম

ঊর্ধ্বতন-অধিনস্তের ‘দেয়াল’ টপকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ইউএনও


ঊর্ধ্বতন-অধিনস্তের ‘দেয়াল’ টপকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ইউএনও

একটি অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে এর অধিনস্তদের সম্পর্ক কেমন হয়, তা কম বেশি অনেকেই জানে। দেখা যায় ঊর্ধ্বতনের ভয়ে প্রায় সময় তটস্থ থাকে অধিনস্তরা। ঊর্ধ্বতনের হুকুমের পর হুকুমে জর্জড়িত, তিক্ত-বিরক্ত থাকেন অনেক অধিনস্ত। ঊর্ধ্বতন সম্পর্কে অধিনস্তদের ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া কোনোটিই তেমন একটা সুখকর নয়।

তবে, ঊর্ধ্বতন আর অধিনস্তের দেয়াল টপকে মানবিক এক সম্পর্কই স্থাপন করেছেন বন্দর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুল্কা সরকার। যেখানে তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিটি সম্পর্কের ধরণই হতে হবে মানবিক। অধিনস্ত হলেই কাউকে ছোট করতে হবে, হেয় করতে হবে, তা নয়; স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতে হবে। কাজ আদায়ের জন্য ধমক নয়, ভালোবাসাটুকুই অনেক বড়।

ইউএনও শুল্কা সরকারের মানবিতকার তেমনই এক প্রমাণ পাওয়া গেছে তার একটি দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে। যেখানে তিনি তার অধিনস্তদের ভাই, আত্মার আত্মীয় হিসেবে সম্বোধন করেছেন।

শুক্রবার (১৫ মে) বিকেলে শুল্কা সরকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যক্তিগত আইডিতে ওই স্ট্যাটাস পোস্ট করার পরপরই তা ব্যাপকভাবে সারা ফেলে। এমন সম্পর্ক, চিন্তা ভাবনা অন্যান্য ঊর্ধ্বতনদের জন্যও শিক্ষনীয় বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইউএনও তার ফেসবুক স্ট্যাটাসটিতে বন্দর ইউএনও শুক্লা সরকার লিখেছেন, ‘এই ছবিগুলো আমার মানে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, বন্দরের অফিস স্টাফদের। নামেই তারা অফিস স্টাফ, ওরা আসলে আমার স্টাফ না, ওরা কবে আমার স্টাফ থেকে ছোট ভাই, আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছে! করোনা পরিস্থিতিতে ওরা যে অমানুষিক পরিশ্রম করছে কারও পক্ষে সেটা অনুধাবন করা সম্ভব না। কি ভাবছেন, এটা তো ওদের কাজ, এজন্য বেতন পায়। কথা হয়তো সত্যি। কিন্তু এই করোনা পরিস্থিতিতে যেখানে অনেক অফিসের স্টাফরা কেউ ছুটিতে কেউবা শিফটে কাজ করছে আর এদের না আছে ছুটি, না শিফট, না শুক্রবার, না শনিবার।

সহকর্মীর উদ্দেশ্যে তিনি লিখেন, প্রথম ছবিটা আমিনের, এই ছেলেটা সার্বক্ষনিক আমার সাথে থাকে, সে প্রতিদিন ৩৩৩ কিংবা আমাদের কাছে খাদ্য সহায়তা পাবার জন্য যে মেসেজগুলো আসে তার কাজ হল সেখানে খাবার পৌঁছে দেওয়া। তাকে বলেছিলাম যেখানে যাবি ছবি তুলে রাখবি ও রাখেনা। সে প্রতিদিন মিনিমাম সাত থেকে আট পরিবারে খাবার দিয়ে আসে। সে বৃষ্টি হোক আর রাত হোক! মাঝেমাঝে আটা নিয়ে বের হয় বিভিন্ন জায়গায় বিতরন করে। একদিন খুব খুশি হয়ে বলে, ‘স্যার আজকে ধন্যবাদ পাইছি, খুব ভালো লাগছে স্যার।’ ওর কথা শুনে শান্তি পাই কোন একজনের ধন্যবাদ পেয়ে ছেলেটা কত খুশি! ইশ্ যদি সবাই তাকে ধন্যবাদ দিতো!

পরের ছবিটা মাসুমের, এই ছেলেটা অফিস সামলায়, সারাদিন আমার বকা খায় তারপরও মুখে হাসি! কত রাত যে তাকে ঘুম থেকে তুলে এনে অফিসে কাজ করিয়েছি এবং করাচ্ছি। একবার রোজার প্রথমদিকে রাত একটায় একজনের দাফন কাজের জন্য পিপিই লাগবে, ছেলেটা বিনাবাক্যে দিয়ে আসলো সেদিন সে বাসায় গেছে রাত ১২ টায়। ওই যে বললাম ওদের কোন ডে/নাইট শিফট নাই। ওদের কাজ কারো চোখে পড়ে না।

তৃতীয় ছবিটা আতিকের, এই ছেলেটাও মাসুমের মত।

আরেক সহকর্মী প্রসংগে শুক্লা সরকার লিখেন, "প্রতাপ! বন্দরের অনেকেই তাকে চেনেন। এই লোকটা দিন/রাত চব্বিশ ঘণ্টা সেবায় ব্যস্ত থাকে। সে হচ্ছে সকল কাজের কাজি। আমি যেখানে যাই সে আমাকে সব প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে"।

সরকারিভাবে পাওয়া গাড়িচালকের প্রসংগে শুক্লা সরকার লিখেন, "আমার ড্রাইভার আজিজ বয়স্ক মানুষ, ডায়াবেটিক আছে তারপরও দিন রাত আমার সাথে ছুটছে, তার কোন অল্টারনেটিভ নেই। তিনি একজনই"।

তিনি আরো লিখেন, "সবার ছবি দিতে পারিনি, এরা ছাড়াও এও সাহেব, ফাহিম, মিজান, এসিল্যান্ডের ড্রাইভার পরশ, মহসিন, পিআইও অফিসের মামুন, সাব এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার বেনজির যার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ সদর শেষ কবে গেছে আমার মনে নাই। এরা কিন্তু শুধু বেতনটুকুই পাচ্ছে, এছাড়া এরা কারো কাছে ধন্যবাদটুকুও পায়নি। কেউ এদের বলে না করোনা যোদ্ধা! এরা সহ এদের পরিবারের সবাই ঝুঁকিতে"।

স্ট্যাটাসের সবশেষে সহকর্মী সবার প্রতি শুভ কামনা প্রকাশ করে শুক্লা সরকার লিখেন, "আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের উত্তম প্রতিদান দিবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তোমাদের সকলকে তোমাদের পরিবারের সকলকে সুস্থ রাখুন, ভাল রাখুন। আল্লাহর রহমত তোমাদের উপর বর্ষিত হোক"।

স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুক্লা, সরকার বলেন, ওরা সবাই অনেক ভালো এবং সৎ মানুষ। প্রত্যেকে আমাকে যথেষ্ট সম্মান এবং মান্য করে। তাদের কখনো কোন কাজে গাফিলতি বা অবহেলা করতে দেখিনি। তাই আমিও তাদেরকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করি।।

তিনি আরও বলেন, এই মানুষগুলো রাতে কয়েক ঘন্টা ঘুমানো ছাড়া বাকী সময়টা মানুষের সেবাতেই নিয়োজিত আছে। আমার পাশে থেকে আমার দিক নির্দেশনা মতো কাজ করছে।কাজের ব্যাপারে তারা সবাই খুব দায়িত্বশীল। তাদের প্রতি স্নেহ ভালোবাসা থেকেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সহকর্মীদের প্রতি নিজের আবেগ ও ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বলে জানান শুক্লা সরকার।

১৫ মে, ২০২০/এসপি/এনটি

উপরে