NarayanganjToday

শিরোনাম

না.গঞ্জের এই হত্যাকান্ডটি যেন ভারতের ক্রাইম পেট্রোলকেও হার মানায়


না.গঞ্জের এই হত্যাকান্ডটি যেন ভারতের ক্রাইম পেট্রোলকেও হার মানায়

একটি হত্যা। কে করেছিলো! ছিলো না ক্লু। মামলা হয়েছিলো নিরীহ একজনের নামে। তিন এই হত্যা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ঘাতক কে? সেই সন্ধানে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদও করে এই তদন্ত সংস্থা। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। সিআইডি নিশ্চিত, যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিলো, তারা কেউই এই হত্যার সাথে জড়িত নন।

না। হাল ছাগেনি সিআইডি। একটি কল লিস্ট ধরে এগিয়ে চলেন। টার্গেট হত্যার রহস্য উদঘাটন। ব্যর্থ হলে চলবে না। এমন ব্রত নিয়ে এগিয়ে যায় পুলিশের এই সংস্থাটি। অবশেষে হত্যার বিশ মাস পর মূল রহস্য উদঘাটনসহ গ্রেফতার করা হয় এর ঘাতকতে। যিনি গ্রেফতারের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

কারো কারো কাছে এটি ভারতীয় ‘সিআইডি’ সিরিয়াল অথবা ‘ক্রাইম পেট্রোল’ এ ঘটে যাওয়া ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু তেমন কিছুই নয়। ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাশারী এলাকার। এই এলাকার আব্দুর রহিমের ভাড়াটিয়া বাড়ি থেকে গত ২০ মাস পূর্বে নাজমা আক্তার ঋতু নামে এক নারীর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মামলা দায়ের হলে এর তদন্তভার পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)’র উপর। মামলাটি ছিলো সম্পূর্ণ ক্লুলেস। তবুও হাল ছাড়েনি সিআইডি।

ওই হত্যা মামলাটির তদন্তে ছিলেন সিআইডি’র উপ-পরিদর্শক (এসআই) সেলিম রেজা। তিনি দীর্ঘ বিশ মাসের তদন্তের পর এই হত্যায় জড়িত একমাত্র ঘাতক লূৎফর রহমানকে গ্রেফতার করেছেন। গ্রেফতার লূৎফর বুধবার (১২ ফেব্রæয়ারি) হত্যার দায় স্বীকার করে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাওছার আলমের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এর আগে ১১ ফেব্রæয়ারি লূৎফর রহমানকে রাজধানীর বংশালের মালিটোলা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি নিহত নাজমা আক্তার ঋতুর প্রেমিক। তারা দুজনই স্বামী স্ত্রী হিসেবে সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাশারী এলাকায় ভাড়ায় বসবাস করতেন। তবে, এখানে তিনি নাদিম হিসেবে পরিচিত। এি পরিচয়েই ভাড়া বাসায় উঠেন।

নিহত নাজমা আক্তার ঋতু ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের দক্ষিন পৈরতলার আবুল হাশেম মিয়ার মেয়ে। এবং ঘাতক লূৎফর রহমান একই জেলার বিজয়নগর থানার বীরপাশা এলাকার মৃত জিতু মিয়ার ছেলে। নবাবপুরে একটি সেলাই মেশিন কিনতে গিয়ে তাদের দুজনের পরিচয় এবং প্রণয়। সেই সূত্রেই তারা এক সাথে থাকা শুরু করেন।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২২ জুন সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাশারী এলাকার আব্দুর রহিমের ভাড়া বাড়ির একটি কক্ষ থেকে নাজমা আক্তার ঋতুর (৩৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। এর দুদিন আগে খুন হন তিনি। এবং লাশ উদ্ধারের চারদিন পর ২৬ জুন সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় নাজমার প্রাক্তন স্বামী নজরুলকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের বড় ভাই। আগস্টে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হলেও আসামি নজরুলকে খুঁজে পায়নি পুলিশ।

নারায়ণগঞ্জ সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ জানান, লূৎফর রহমান নিহত নাজমা আক্তারের প্রেমিকা ছিল। তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাশারী এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেয়। লূৎফর রহমান তার নাম সেখানে নাদিম বলে জানায়। লূৎফর ও নাজমা আক্তার উভয়েই বিবাহিত ছিল। নাজমার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে আর লূৎফরের স্ত্রী মৃত। তবে তার দুই সন্তান রয়েছে।

তিনি আরও জানান, নাজমার সাথে তার পরিবারের তেমন যোগাযোগ ছিল না। সে টেইলার্সের কাজ করতো। টেইলারি মেশিনের একটি যন্ত্র কিনতে গিয়েই রাজধানীর নবাবপুরে নিহত নাজমার সাথে পরিচয় হয় লূৎফরের। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। লূৎফরের নাম পরিবর্তন করে নাদিম পরিচয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের নিমাইকাশারী এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেয় তারা। সেখানে তারা বসবাস করতো। কিন্তু এক মাসের মধ্যেই তাদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি শুরু হয়। এক রাতে টিভি বন্ধ করা নিয়ে দুজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়ার এক পর্যায়ে সিমেন্টের তৈরি লাঠি আকারের বস্তু দিয়ে নাজমার মাথায় বাড়ি দেয় লূৎফর। এতে মারা যায় নাজমা। লাশ ঘরে রেখেই দরজা তালা মেরে চলে যায় সে। দুদিন পর লাশ পঁচা গন্ধ বের হলে আশেপাশের লোকজন পুলিশে খবর দেয়। পরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে।

তিনি বলেন, লাশ উদ্ধারের চারদিন পর ২০১৮ সালের ২৬ জুন সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় নাজমার প্রাক্তন স্বামী নজরুলকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের বড় ভাই। আগস্টে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হলে আসামি নজরুলকে খুঁজে পায় না পুলিশ। দীর্ঘ সময় নানাভাবে তদন্ত করেও কোনো ক্লু পাচ্ছিলো না সিআইডি। একটি পাসপোর্টের সূত্রধরেও তদন্ত চালায় তদন্তকারী সংস্থা। কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয়নি। এক পর্যায়ে নাজমার ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে তার এক প্রেমিককেও জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। তবে তার সাথেও হত্যাকান্ডের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এই কললিস্টের সূত্রেই লূৎফরের কাছে পৌঁছায় সিআইডি। পরে গত মঙ্গলবার দীর্ঘ সময় পর হত্যাকান্ডের মূল হোতাকে গ্রেফতার করা হয়। সে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০/এসপি/এনটি

উপরে