NarayanganjToday

সীমান্ত প্রধান

কবি ও সংবাদকর্মী

বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ


আমি কতটা সত্য বলতে পারি তা জানি না। তবে অকপটে এটুকু স্বীকার করি যে, বঙ্গবুন্ধ শেখ মুজিবর রহমানের জন্ম না হলে বাংলাদেশেরও জন্ম হত না। এই জন্যই বলি, বঙ্গবন্ধু কোনো ব্যক্তি নন; কোনো ব্যক্তির নন, বঙ্গবন্ধু মানেই গোটা বাংলাদেশ। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মানেই প্রতিবাদের জ্বলজ্যান্ত এক প্রতীক।

মহাকালের কাব্যর কথা অনেক শুনেছি। আমার কাছে মনে হয় মহাকালের কোনো কাব্য যদি কেউ রচনা করে থাকেন, সে আর কেউ নন; জাতির জনক বঙ্গবন্ধুই রচনা করেছিলন। ৭ মার্চের ভাষণ হচ্ছে সেই মহাকালের কাব্য। যে কাব্য রচনা না হলে শৃঙ্খল ভাঙার গান গাইতে পারতো না বাঙালি। কবি কাব্য রচেছেন, কোটি কোটি বাঙালির রক্তে সেই কাব্য টগবগ করে স্ফুলিঙ্গ হয়ে ফুটেছে। বাঙালি ঘর ছেড়ে বাইরে এসেছে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের নাম লিখেছে। দীর্ঘ নয় মাস স্বশস্ত্র যুদ্ধ আর ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছি লাল সবুজের পতাকা। এ পতাকা, এই দেশ কারো দানে পাওয়া নয়।

সায়েরা বেগম ও শেখ লুৎফর রহমানের পরিবারে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ‘টুঙ্গিপাড়ায়’ জন্মগ্রহণ করেন ছোট্ট এক শিশু। যার নাম রাখা হয়েছিল শেখ মুজিবর রহমান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন। কে জানতো, এই শেখ মুজিবর রহমানের হাত ধরেই জন্ম নিবে একটি দেশ। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেন স্বাধীন বাঙলার স্বপ্নদ্রষ্টা। জীর্ণশীর্ণ একটি দেশের মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলন তিনি। শুধু স্বপ্ন দেখিয়েই ক্ষান্ত হননি। কাক্সিক্ষত সেই স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সামনে থেকে নেতৃত্বও দিয়েছেন, কোটি বাঙালিকে উজ্জীবিত করেছিলেন তিনি।

অল্পবয়স থেকেই তার রাজনৈতিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে থাকে। ১৯৪০ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। কট্টরপন্থী এই সংগঠন ছেড়ে ১৯৪৩ সালে যোগ দেন উদারপন্থী ও প্রগতিশীল সংগঠন বেঙ্গল মুসলিম লীগে। এখানেই সান্নিধ্যে আসেন হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে রক্ষণশীল কট্টরপন্থী নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কর্তৃত্ব খর্ব করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ।ভাষা আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শেখ মুজিব। ১৯৪৮ সালে ভাষার প্রশ্নে তার নেতৃত্বেই প্রথম প্রতিবাদ এবং ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয় যা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর থেকেই শাসনের নামে বাঙালির ওপর একের পর এক অত্যাচার করে আসছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি। অবহেলা, নির্যাতন আর বাঙালিকে বারবারই করা হয়েছিল অধিকার বঞ্চিত। ইচ্ছে মাফিকভাবে সব কিছুই চাপিয়ে দিতে চাইতো তারা। যখন-তখন কেড়ে নিতে চাইতো বাঙালির অধিকার। তাদের জোর-জুলমের কারণে বাঙালির মনে ধীরে ধীরে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। প্রতিবাদ করতে শিখে বাঙালি। এরমধ্যে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৭০ সালের আগস্টে বন্যায় ত্রাণের অপ্রতুল্যতায়সহ নানা বঞ্চনার কারণে বাঙালিদের মধ্যে বিদ্রোহী মনোভাব সৃষ্টি হয়। যা দৃশ্যমান হয় ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। সে নির্বাচনে বাঙালি জাতির অসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবরের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এসময় অন্যতম দাবি ছিল স্বায়ত্বশাসন ও মিলিটারি শাসনের অবসান।

পশ্চিম পাকিস্তানিরা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তারা নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিতে থাকে। নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় দেশটি। ’৭১-এর ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তুঅধিবেশন শুরুর দুই দিন আগে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতারে এক ভাষণের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে অধিবেশন বাতিলের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ-বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, ক্রোধে ফুঁসে উঠতে শুরু করে মানুষ।

পশ্চিমারা বিদ্রোহী বাঙালি দমনে আগ্রাসি হয়ে উঠে। মার্চের শুরু থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র বাঙালি হত্যা করতে থাকে। এরমধ্য দিয়েই ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। এই ভাষণ থেকেই তিনি ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। তার ভাষণে উজ্জীবিত হয়ে উঠে ৭ কোটি বাঙালি। এর ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট' নামে পাকিস্তানি দানবরা মেতে ওঠে নির্বিচারে স্বাধীনতাকামী বাঙালি নিধনযজ্ঞে। যা বাঙালি জাতিসহ বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা।

ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে মাত্র এক রাতেই হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল প্রায় অর্ধলক্ষাধিক ঘুমন্ত বাঙালিকে। ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া সেই নিধনযজ্ঞ চলেছে টানা ৯ মাস। পাকিস্তানি পিশাচদের সাথে যোগ দিয়েছিল তাদের এ দেশীয় দোসর ঘাতক দালাল রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর সদস্যরা। যার ফলে বিস্তৃত হয়েছিল লাশের স্তুপ। পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত গণহত্যার মধ্যে অন্যতম ছিল ’৭১-এর গণহত্যা।

ইতিহাস বলছে, সোভিয়েট যুদ্ধবন্দি (১৯৪১-৪২) হত্যা, ইহুদি হলোকাস্ট (১৯৩৩-৪৫), রুয়ান্ডার (১৯৪৪) গণহত্যা এবং বাংলাদেশে (১৯৭১) গণহত্যা এই বিংশ শতাব্দির মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাগুলোর অন্যতম। পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালে নিজেই একটি কনফারেন্সে ঘোষণা করেছিলন, ‘আমরা ওদের (পূর্ব পাকিস্তান) ৩০ লক্ষ শেষ করে দেব আর বাকীরা আমাদের কাছে জীবন ভিক্ষা চাইবে’। এতে করেই বোঝা যায়, কতটা পরিকল্পিতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিরা স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নরকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। সেসব বর্ণনা গা হীম করার মত। কতটা নিষ্ঠুর, বর্বরতম সেই হত্যাযজ্ঞ, তা দেশি বিদেশি বিভিন্ন সংবাদপত্র, প্রত্যক্ষদর্শী এবং মুক্তিযুদ্ধের ওপর গবেষণাধর্মী লেখা পড়লেই বোঝা যায়।

’৭১-এর ২৫ মার্চ দুপুর থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশের পরিস্থিতি ছিল থমথমে।এদিন সকাল থেকেই সেনা কর্মকর্তাদের তৎপরতা ছিল অন্য যেকোনো দিনের থেকে বেশি। হেলিকপ্টারযোগে তারা দেশের বিভিন্ন সেনানিবাস পরিদর্শন করে বিকেলের মধ্যে ঢাকা সেনানিবাসে ফিরে আসেন। ঢাকার ইপিআর সদর দফতর পিলখানাতে অবস্থানরত ২২তম বালুচ রেজিমেন্ট পিলখানার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিল। দফায় দফায় চলা বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের সিরিজ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি এয়ারপোর্ট চলে যান।

ইয়াহিয়া খান শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ এড়িয়ে গিয়ে নিরপরাধ বাঙালিদের ওপর কাপুরুষোচিত সশস্ত্র হামলা চালানোর নির্দেশ দেন এবং রাত পৌনে আটটায় তিনি পূর্ব পাকিস্তান থেকে গোপনে বিমানযোগে করাচি চলে যান। ইয়াহিয়ার নির্দেশ মোতাবেক পাকহানাদার বাহিনী জল্লাদের মতো বাংলাদেশের নিরস্ত্র-নিরপরাধ জনগণের ওপর মেশিনগান, মর্টার আর ট্যাংক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্বিচারে গণহত্যা চালায়।পূর্ব পরিকল্পিত অপারেশন সার্চলাইটের নীলনকশা অনুযায়ী আন্দোলনরত বাঙালিদের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘৃণ্য লক্ষ্য নিয়েই ওই আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি নরপিশাচেরা। এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সব সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা। যা বাঙালির ইতিহাসে বিভিষীকাময় একটি কালরাত।

২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তারা প্রথমে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন, এরপর একে একে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এর চারপাশ, ধানমন্ডি, পিলখানার পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস সদর দফতরসহ রাজধানীর সর্বত্র নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরেও হত্যাযজ্ঞ চালায় তারা। গান পাউডার ছিটিয়ে পুলিশ সদর দফতরসহ বিভিন্ন এলাকায়আগুন ধরিয়ে দেয়য় হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে এদিন রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। এরমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনা। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এদিন।

মার্চের ২৫ তারিখ রাত ১১টার দিকে ব্রিগেডিয়ার জহির তার সৈন্য সামন্ত নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির দিকে রওনা হয়। তার সাথে ছিলেন মেজর বিল্লাল, ক্যাপ্টেন সাঈদ ও ক্যাপ্টেন হুমায়ূন। তারা তেজগাঁ বিমানবন্দর, সংসদ ভবন (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়), মোহাম্মদপুর হয়ে ধানমন্ডি পৌঁছান। যখন মধ্যরাত তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীবঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশ করে। চার পাশটা ছিল ঘনকালো অন্ধকার। রাস্তার বাতিগুলো নেভানো। ক্যাপ্টেন হুমায়ূন প্রথমে তার দল নিয়ে প্রাচীর টপকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশ করে। এদিন পুরো ধানমণ্ডি ছিল জনমানবশূন্য। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে কিছু পুলিশ পাহারা ছিল। গোলাগুলির শব্দে তারাও সরে পড়েন।

বঙ্গবন্ধুর বাড়ির নিচতলায় তখন কেউ ছিল না। একের পর এক দরজা খুলে কাউকে পাওয়া গেলো না। একটা রুম ভেতর থেকে আটকানো ছিলো। ওপরে ওঠার পর কেউ একজন জহির খানকে জানালো‘বদ্ধ ঘর থেকে কেমন অদ্ভুত শব্দ আসছে (সম্ভবত ওয়ারল্যাস ট্রান্সমিশন করছিলেন মুজিব)। এরপরই মেজর বিল্লালকে দরোজা ভাঙার নির্দেশ দিয়ে সাঈদের দল এলা কিনা তা দেখতে নিচে নেমে আসেন জহির। ব্রিগেডিয়ার জহির খানের লেখা ‘ঞযব ডধু ওঃ-ডধং’ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার বর্ণনা দিয়েয়েছেন। কোনো রকম লুকোচুরি না করেই তিনি সেরাতের কথাসহ তার সেনা জীবনের ইতিবৃতান্ত এখানে লিখেছেন। বাঙালির ওপর তার রূঢ় আচরণের কথাও তিনি পাশ কেটে যাননি।

তিনি লিখেছেন, শেখ মুজিবের বাড়ির নিচতলায় সাঈদের সঙ্গে কথা বলার সময় একটা গুলির শব্দ হলো। এরপর গ্রেনেড বিস্ফোরন ও তার সাথে সাব-মেশিনগানের ব্রাশ। ভাবলাম কেউ হয়তো শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে। পরে জানতে পারি মেজর বিল্লালের লোকেরা যখন দরজা ভাঙার চেষ্টা করছিলো তখন কেউ একজন সেদিকে পিস্তলের গুলি ছোড়ে। ভাগ্যক্রমে কারো গায়ে লাগেনি। বাধা দেয়ার আগেই বারান্দার যেদিক থেকে গুলি এসেছিলো সেদিকে গ্রেনেড ছোড়ে একজন সৈনিক। এরপর সাবমেশিনগান চালায়। গ্রেনডের প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আওয়াজে বদ্ধ সে রুমের ভেতর থেকে চিৎকার করে সাড়া দেন শেখ মুজিব এবং বলেন তাকে না মারার প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি বেরিয়ে আসবেন। নিশ্চয়তা পেয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। বেরুনোর পর হাবিলদার মেজর খান ওয়াজিরবঙ্গবন্ধুর গালে চড় মারেন।

ব্রিগেডিয়ার জহির লিখেন, ‘শেখ মুজিবকে বললাম আমার সঙ্গে আসতে। উনি জানতে চাইলেন পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারবেন কিনা। আমি তাকে তা তাড়াতাড়ি সারতে বললাম। এরপর গাড়ির দিকে হাটা ধরলাম। এরমধ্যে ‘শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করেছি’ তা সদরে রেডিও বার্তায় পাঠিয়ে দিয়েছি। এরপর মুজিব বললেন,ভুলে পাইপ ফেলে এসেছেন তিনি। আমাকে নিয়ে তিনি পাইপ আনতে গেলেন। এরমধ্যে মুজিব আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার কোনো ক্ষতি করবো না। তিনি বললেন, তাকে ফোন করে বললে নিজেই চলে আসতেন।

মাঝের একটি ট্রাকে মুজিবকে বসিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে রওনা দেন ব্রিগেডিয়ার জহির সহ তার বাহিনী। এসময় তার মনে হলো মুজিবকে গ্রেপ্তার করার পর কোথায় রাখতে হবে, কার কাছে হস্তান্তর করতে হবে তা জহিরকে কিছুই জানানো হয়নি। এ কারণে সংসদ ভবনে মুজিবকে আটকে রেখে পরবর্তী নির্দেশনা জানতে ক্যান্টনমেন্ট রওয়ানা হন জহির। সেদিন সংসদের সিড়িতে বসিয়ে রাখা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। লে. জেনারেল টিক্কা খানের সদর দপ্তরে আসেন ব্রিগেডিয়ার জহির। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যে কক্ষটিতে মুজিব ছিলেন, সেখানেই তাকে রাখা হবে।এরপর ১৪ ডিভিশন অফিসার্স মেসে স্থানান্তরিত করা হয় তাকে। একটি একক বেডরুমেবঙ্গবন্ধুকে রেখেবাইরে প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

‘শেখ মুজিবকে কোথায় রাখা হয়েছে’ পরদিন ব্রিগেডিয়ার জহিরের কাছে জানতে চাইলেন মেজর জেনারেল মিঠা। বঙ্গবন্ধুর অবস্থান জানার পর উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি বললেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে একদমই ধারণা নেই সংশ্লিষ্টদের। অফিসার্স মেস থেকে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা খুব সহজেই নিতে পারবে যে কেউ। এরপর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের চারতলায় শেখ মুজিবকে সরিয়ে নেওয়া হলো। সেখান থেকেই ক’দিন পর করাচি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে।

গ্রেপ্তারের আগে ইচ্ছে করলে বঙ্গবন্ধু পালাতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই কাপুরুষোচিত পলায়নে বিশ্বাসী ছিলেন না। বীর কখনোই পালায় না। বঙ্গবন্ধু সেই পথ অবলম্বন করেছিলেন। তিনি সব ধরণের পরিস্থিতিই মোকাবেলা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টেও তিনি পালান নি, যখন একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা তাকে হত্যা করতে এসেছিলেন। তিনি প্রাণভিক্ষা চাননি। বরং বুক চিতিয়েই দাঁড়িয়েছিলেন বন্দুকের নলের সামনে। সেই রাতে তারা কাপুরুষের মত হত্যা করেছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। সেই হতাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সদ্য স্বাধীন জাতির জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে। সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক শূণ্যতা, ব্যাহত হয় গণতান্ত্রিক উন্নয়নের ধারা।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের চোখজুড়ে স্বপ্ন ছিল একটি সোনারবাংলা গড়বেন। যে বাংলা হবে সত্যিকারে সোনায় মোড়ানো। সুষম বণ্টন হবে সর্বত্র। ধর্ম-বর্ণ জাত-পাতের কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। দেশ হবে সবার। বঙ্গবন্ধুর শূণ্যতায় সেই ধারা ব্যাহত হয়। পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। তবে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই তার কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে আজকের বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনারবাংলার দ্বারপ্রান্তে এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি। এই জয়যাত্রার পথ যদি ব্যাহত না হয়, তবে আমরাও বিশ্বের মধ্যে উন্নত জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাবো। আমরাও গর্বের সাথে উচ্চ স্বরে বলতে পারবো, ‘দেখ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশের মানুষ আমরা, ভিখারি নই, গর্বিত বাঙালি।’

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে