NarayanganjToday

তাসলিমা আক্তার মুক্তি

শিক্ষার্থী

স্টকহোম, সুইডেন

নারীর ‘না’ পুরুষতন্ত্র মেনে নিতে পারে না


আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ঘরে বাইরে, অফিস আদালতে, রাস্তা-ঘাটে কিছু নারী পুরুষ গোঁজামিল যুক্তিবিদ আছে। তারা উভয়ই যেকোনো মুখরোচক মার্কেটে হিট খাওয়া নারীসংক্রান্ত যেকোনো বিষয় টেনে এনে মাঝখানে অন্য কিছু একটা গোঁজামিল যোগ করে পত্র-পত্রিকা ও সোস্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় লিখে প্রমাণ করতে চায় তারা খুব পন্ডিত যুক্তিবাদী।

এই যে তারা পন্ডিত জাতিকে তারা উদ্ধার করে ফেলেছেন তা প্রমানে আরো যা কিছু গোঁজামিল যোগ করা দরকার হয়, তারা তা করে থাকে অতি উৎসাহে। আর তা যদি হয় নারী কার সাথে বিছানার গেলো বা কার সাথে বিছানায় শুতে রাজি হলো না। অথবা নারী তার ইচ্ছে অনুযায়ী তার ভালোবাসার পুরুষ সঙ্গীটির সাথে বিছানায় গেলো। এবং পরবর্তীতে কোনো একটা কারণে তাঁদের সম্পর্ক টিকলো না বা ছেলে মেয়ে দুজনের মধ্যে যে কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করলো, এটা তাদের দুজনেরই সমানভাবে অধিকার আছে বৈকি। কিন্তু এক্ষেত্রে যদি নারী তার প্রেমিক পুরুষটির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তাহলে তো কথাই নেই৷ বাঁকা নারী দূর্বল নারী ‘না’ করার সাহস পায় কিভাবে?

পুরুষতন্ত্রটির প্রচণ্ডভাবেই আত্মসম্মানে লাগে যে নারী হয়ে ‘না’ করলো। এ-ই ‘না’ শব্দটির সাথে আমাদের সমাজের পুরুষরা এবং কিছু পুরুষতন্ত্র পূজারী নারীরাও অভস্ত্যতা গড়তে পারেনি। সে আমার বাপ ভাই বন্ধু প্রেমিক সহপাঠী সহকর্মী যেই হোক না কেনো, আমি কাউকে এমন সত্য সুন্দর দেখিনি। বা দুই একজন আছে হয়তো কিন্তু তা সমগ্র কোনো জাতির জন্য উদাহরণ স্বরুপ হতে পারেনা। আর প্রেমিকটি সম্পর্ক থেকে বের হয়েই তার পরিচিত বন্ধু মহলে বলে বেড়ায় দাপটের সাথে, সে তার প্রেমিকাকে শরীরের কোথায় কোথায় স্পর্শ করেছে, কতোবার তারা যৌন সম্পর্ক স্হাপন করেছে। মেয়েটি বিছানায় ঠিক কতটুকু তাকে সুখ দিতে পেরেছে বা পুরুষটি মেয়েটিকে কতটুকু ভোগ করতে পেরেছে। সম্পর্কে থাকাকালীন সুন্দর মুহুর্তের ছবি ভিডিও বা কথোপকথনের রেকর্ড হাতিয়ার করে চলে হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড। কখনো সোস্যাল মিডিয়ায় বা কখনো বাস্তব জীবনে নানাভাবে ভুক্তভোগী পার করছেন এই অসহায়ত্ব। ব্যাপারটা এমন যে নারীকে নিয়ে তামাশা করা তাদের পৈশাচিক সুখের একটি চিরাচরিত মানসিক রোগ। দৃষ্টিভঙ্গি কথায় ছলেবলে চলে নারীকে যৌন হেনস্তা করা এখন আরও সহজ হয়ে গেছে ইন্টারনেটের যুগে। কিন্তু নারী আসলেই কি ভোগ-বাসনার কোনো বস্তু আর যৌনতা কি ভোগের কোন বিষয়?

সামাজিক ভাবে একটি মেয়েকে ছোট প্রমাণ করতে তার অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যা করা দরকার তা এ-ই সমাজের পুরুষগুলো দিনের পর দিন করে আসছে, পুরুষতন্ত্রের প্রভাব বিস্তার করে। তাদের কাছে নারীবাদ মানে হাস্যকর কিছু সহজ দামে যৌনতা ক্রয়ের প্রক্রিয়ায় তারা মুখোশধারী ধর্ষক।

সমাজে আরেক রকম পুরুষ আছে বৈকি, যারা নারীকে দিনে একশোজন লোকের সাথে বিছানায় কল্পনা করে পৈশাচিক সুখ পায়! এবং তাদের বস্তাপঁচা মাথা বিশ্বাস করে অনায়াসে। যে যেখানে সেখানে পায়জামা খুলে আবেগ ভালোবাসাহীন সম্পর্ক স্হাপন করা যায়। নারী হলো ভোগের মাংস কখনো দু'টাকায় রাতের রাস্তায় সস্তাদামে তাদের পাওয়া যায়!

প্রতিবেশীরা তো একলা নারী, অবিবাহিত কোনো নারীর ছায়াও মাড়াতে চায়না। হা আমি শহরের কথা বলছি তবে, গ্রামে আরও করুন দশা সেখানে নারী শুধুই বাড়ীর দারোয়ানের ভূমিকাই পালন করছে। আর চুলার ছাই তুলে রান্না করে স্বামী দেবতাকে পূজা করা আর রাতে দেবতার পূজার ভোগ হওয়া বিছানায়। এ-ই হলো শহরে গ্রামে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়া নারীর প্রাত্যহিক জীবনের ছক! বাপের বাড়ী আর শ্বশুর বাড়ী নারীর ঠিকানা আর মৃত্যুর পর মাটির নিচে নিজের বলে কিছু নেই। সংসারে মানসিক শারিরিক পরিশ্রমের পরেও নারী হয় তুচ্ছ কোনো চিত্র। অনেকটা কচু পাতার ওপরে এক ফোঁটা পানির মতোই নারীর জীবনছক।

নারী কতোটুকু খাবে কি পোশাক পরবে শিক্ষা স্বাস্থ্য কর্ম জীবনেও তার নির্ধারিত ধর্মীয় গোঁড়ামি কুসংস্কার অজ্ঞায় সীমাবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা চলতে থাকে অবলিলায়। মানসিক দাসত্ব প্রথার এ শিকল বা সংশ্রয় নামক দড়িটি কাটতে এখন অবশ্য বেশির ভাগ নারীই শিখে গেছে। তবুও নারী কতোটুকু উচ্চস্বরে হাসবে কাঁদবে তা ঠিক করার অধিকার নারীর নেই বলেই পুরুষতন্ত্র ধর্ম মনে করে। মুসলিম পরিবার হলে তো তা আরও ভয়ংকর রকম অবস্থা হয় নারীর জীবনে।

অথচ নারী কর্ম জীবনে উন্নতি করেছে, ব্যক্তি জীবনে অর্থনৈতিক সামাজিক পরিবারের গৎবাঁধা নিয়ম গুলো থেকে বের হয়ে এসে নিজে নিজেই লড়াই করছে। এমন গল্পের নারী বাংলাদেশে বেশির ভাগই আছে। নারী কর্মক্ষেত্রে অথবা ব্যক্তিক জীবনে কোনো বড় পদে থাকলে বা অর্থনৈতিক ভাবে সচল হলেও পুরুষতান্ত্রিক ধর্মমতের মাথাগুলো বিশ্বাস করে যে, নারী তা শরীর দিয়েই করেছে, মগজ মেধা কঠোর পরিশ্রম দিয়ে নয়।

প্রতিদিন রাস্তা ঘাটে পাবলিক বাসে কর্মক্ষেত্রে অফিসের সহকর্মী ও বসের  দ্বারা দিনের পর দিন যৌন আক্রমনের ও মানসিক ভাবে কত-শত কথায় তারা ধর্ষিত হচ্ছে অথচ তারা হাল ছাড়ছে না। নারী যুদ্ধ করেই চলেছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বুড়ো সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে! জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নারী লড়াই করে যাচ্ছে ঘরে বাইরে সমানতালে। কখনো কোনো পুরুষ উদারতা দেখালেও পরক্ষণেই তার ফায়দা লুটতে ফাঁদ পাতে এমন পুরুষেই আমাদের সমাজ ব্যবস্থা চলছে। এর মধ্যে নারী পুরুষতন্ত্র মাথাও আছে সমানভাবে। নারী কলিগ নারী বন্ধুটিও কখনো কখনো দূর্বলতার সুযোগ নিতে ছাড়ে না। চায়ের আড্ডায় বসে রসিকতা করতে ছাড়েনা, সেই যে কোনো একদিন জীবনযুদ্ধ করা নারীটি বলেছিলো মনের কিছু লুকানো ব্যথার কথা। মানসিক ভাবে অসুস্থ করে দেয়া সমাজের কাছে মাথা নুইয়ে না পড়ে কিভাবে পৃথিবীর কল্যানে অংশীদার হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেই সংগ্রামের কথা।

সারাজীবন ধরে পরিবার থেকে ও সমাজের নারী বাবা মা ভাই বোন প্রতিবেশী পুরুষতন্ত্রগুলোর দ্বারা কতো ভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে। কখনো ভার্সিটির টিচার দ্বারা কথায় ধর্ষিত হচ্ছে, শহরে হোস্টেল বা বাসা ভাড়া করে একলা থাকার কারনে। জীবন সেখানে বা পেছনে কতোটা সহজ ছিলো আত্মহত্যাকে বন্ধু করে আলিঙ্গন করার জন্য। প্রেমিক স্বামী দ্বারা প্রতারিত হয়ে বা কখনো যৌনতা কি না জানার আগেই নিজ পরিবার বা কাছের আত্মীয়দের দ্বারা চাইল্ড এবিউজিংয়ের শিকার হওয়া, কখনো ধর্ষিত হওয়া। অথচ প্রতিনিয়ত বৈষম্যের নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীটি মৃত্যুকে আপন করে নেয়নি বরং উল্টো নিজের দূর্বলতাকে শক্তি করে সমাজের পুরুষতন্ত্রের পূজারি না হয়ে, তাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নারীটি একা বাঁচতে শিখে গেছে কোনোভাবে নিঃস্বাস নেওয়ার আনন্দ পেতে শিখে গেছে। সমাজের অন্যের পিছনে লেগে থাকা পঁচা দুর্গন্ধ মাথাগুলোর কথায় কান ও মাথা না দিয়ে নারী এগিয়ে চলছে দূর্বার গতিতে! 

এশিয়ান সংস্কৃতির প্রভাব নারী জীবনে সকল দেশে একই বলা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে নারী তার জায়গা করে নিয়েছে ইতিমধ্যেই। নারী পুরুষের সমান অধিকার মানে তারা বুঝে পুরুষ যদি রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে নারী কেনো নয়। নারী অধিকারের আধুনিকতার ছোঁয়া বাঙ্গালী পুরুষদের এখনো ছুঁতে পারেনি।

সমাজ বদলাতে নারী পুরুষ দু'জনেরই ভূমিকা পালন করতে হবে। একে অপরকে বন্ধুত্বপূর্ন কাজের জায়গা তৈরি করে দিতে হবে তবেই হবে পরিবর্তন। নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী স্পিকার, নারী বিরোধী দল দিয়ে দেশ পরিবর্তন হবেনা, সমাজ পরিবর্তন হবেনা। যদিনা সমাজের মগজ থেকে পুরুষতন্ত্র চিরতরে না বের করে দেয়।

নারী দাসত্ব প্রথা পৃথিবীর সংসার সূচনা লগ্ন থেকেই। এ প্রথা এখন নারীর ভেতরে ভর করে আছে ভয়ংকর ভাবে। কিছু নারী পারছে বের হতে, ভবিষ্যতে আরও হয়তো পারবে। তবে সংখ্যা লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে পুরুষকেই এগিয়ে আসতে হবে বন্ধু হয়ে। নারীবাদ নারী পুরুষ উভয়ের অধিকারের কথা বলে। নারীবাদ নারী অধিকার মানে মুক্ত অবাধ যৌনতা নারী কর্তৃত্ব সমাজ ব্যবস্থা, সেই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পুরুষ যেমন তার সঙ্গী ঠিক করতে পারে নারীও ঠিক করতে শিখুন, জীবনসঙ্গী হিসেবে নারী কাকে চায় বা চায়না। জোড় করে বিয়ের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া, নির্ধারিত ধর্মীয় রীতিনীতি সংস্কৃতির পোশাক নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়াই হলো নারী নির্যাতন। নারী তার জীবনে যা চাইবে পুরুষের পাশাপাশি তারও স্বাধীন ভাবে সে সকল কিছুর সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই হলো নারী অধিকার। বস্তাপঁচা বুড়ো সমাজ ব্যবস্থা নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়াই নারী নির্যাতন। ব্যবসার ক্ষেত্রে স্বল্প পোশাকে নারীকে বিজ্ঞাপনের পন্য করে টাকার কাছে সার্কাস করাও পুরুষতন্ত্রের কর্মকান্ড। কিন্তু নারীই ঠিক করুন, নারীর পোশাক কি হবে, পুরুষ নয়। বাবা মা ভাই বোন নয়। জোড় করে নারীর ওপর সকল কিছু চাপিয়ে দেওয়াকেই বলে নারী নির্যাতন, নারী বৈষম্য!

সর্বোপরি সকল ক্ষেত্রে নারীকে সম্মান করা হউক নারী নির্যাতন বন্ধ করে নারীকে সমাজ পরিবর্তনে হাতিয়ার হউক! নারীকে একদলা মাংসপিণ্ড না ভেবে মানুষ ভাবা হোক। নারীকে মানসিক দাসত্ব প্রথা রোগ থেকে বের করতে পুরুষই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুন। কল্যান হোক নারী-পুরুষ উভয়ের দ্বারা সমান ভাবে এই পৃথিবীর। তবেই আগামীর শিশুটি পাবে নিরাপদ সুন্দর পৃথিবী! সমাজ পরিবর্তনে নারী পুরুষ একে অপরের শুভাকাঙ্ক্ষী হোক, কর্মক্ষেত্রে বন্ধু হোক!

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। নারায়ণগঞ্জ টুডে-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য নারায়ণগঞ্জ টুডে কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

উপরে